

লেখক আজিজুল হক সমসাময়িক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার নেতা
“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”—বাক্যটি বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে বহুল উচ্চারিত একটি স্লোগান। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নেতা ও সংগঠনের বক্তব্যে এর ব্যবহার লক্ষ করা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বাক্যটি কি কেবল ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের প্রকাশ, নাকি কখনো কখনো রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা অর্জন, ভোটের হিসাব মেলানো এবং ক্ষমতার সমীকরণ ঠিক রাখার কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে?
প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ধর্ম মানুষের বিশ্বাস, পরিচয় ও নৈতিকতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। আর রাজনীতি পরিচালিত হওয়া উচিত নীতি, আদর্শ, জনকল্যাণ ও জবাবদিহির ভিত্তিতে। যখন ধর্মীয় অনুভূতি রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশ হয়ে ওঠে, তখন সেই বক্তব্যের উদ্দেশ্য, ব্যাখ্যা ও বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা নাগরিক সমাজের দায়িত্ব।
এ প্রশ্ন শুধু বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য নয়; বরং সব রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং সাধারণ মানুষের জন্যও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
সম্প্রীতি ও আকিদা—দুটিকে এক করে দেখার সুযোগ নেই
বাংলাদেশ বহু ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের দেশ। এ দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং নাগরিক মর্যাদা রক্ষার জন্য পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অপরিহার্য। কোনো মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তার প্রতি বিদ্বেষ, বৈষম্য কিংবা অন্যায় আচরণ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
পবিত্র কোরআনের সূরা আল-মুমতাহিনার ৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাদের সঙ্গে সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে নিষেধ করেননি, যারা ধর্মের কারণে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি কিংবা তাদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেনি। এ আয়াত ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা সত্ত্বেও ন্যায়পরায়ণতা ও মানবিক আচরণের গুরুত্ব তুলে ধরে।
অন্যদিকে, পবিত্র কোরআনের সূরা আল-কাফিরুনের শেষ আয়াতে বলা হয়েছে, “তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম, আর আমার জন্য আমার ধর্ম।” (সূরা আল-কাফিরুন, ১০৯:৬)
এই আয়াত ধর্মীয় বিশ্বাস ও ইবাদতের স্বাতন্ত্র্যের শিক্ষা দেয়। সুতরাং অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, তাদের অধিকার রক্ষা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার সঙ্গে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস ও বিধান অনুসরণ করার কোনো মৌলিক বিরোধ নেই।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি সৌহার্দ্য প্রদর্শন এক বিষয়; আর কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ কিংবা সেটিকে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা আরেক বিষয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে অনুষ্ঠানের প্রকৃতি, অংশগ্রহণের ধরন এবং ইসলামী বিধানের প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অতএব, ধর্মীয় সম্প্রীতির নামে আকিদার স্বাতন্ত্র্য অস্বীকার করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি আকিদার প্রশ্ন তুলে অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানোও ইসলামের ন্যায়নীতি ও সদাচরণের শিক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
রাজনৈতিক বক্তব্যে ধর্মের ব্যবহার কতটা নৈতিক?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় অনুভূতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতা। ফলে রাজনৈতিক বক্তব্যে ধর্ম, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সম্প্রীতির প্রসঙ্গ আসতেই পারে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন একই ধর্মীয় প্রশ্নকে রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়।
যে দল ইসলামী মূল্যবোধের কথা বলে, জনগণ তার কাছে সততা, আমানতদারি, ন্যায়বিচার, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং জনকল্যাণের বাস্তব প্রতিফলন প্রত্যাশা করে। আবার যে দল ধর্মীয় বহুত্ববাদ ও সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলে, তার কাছেও প্রত্যাশা থাকে—ধর্মীয় স্বাধীনতা ও পারস্পরিক সম্মান নিশ্চিত করার।
কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দল যদি ধর্মীয় বক্তব্যকে শুধু নির্বাচনী প্রচার, জনপ্রিয়তা অর্জন কিংবা প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, অথচ বাস্তবে ঘোষিত আদর্শের প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই রাজনীতির নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
পবিত্র কোরআনের সূরা আল-মায়িদার ২ নম্বর আয়াতে সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে সহযোগিতা করতে এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা না করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই নীতি রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও নৈতিক দায়বদ্ধতার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।
ধর্মের নাম উচ্চারণ করাই ধর্মীয় আদর্শ অনুসরণের প্রমাণ নয়। বরং সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, আমানত রক্ষা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থানের মধ্য দিয়েই আদর্শের বাস্তব মূল্যায়ন হয়।
ক্ষমতার রাজনীতিতে আদর্শ কি গৌণ হয়ে পড়ছে?
রাজনীতির উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জনগণের অধিকার রক্ষা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং মানুষের জীবনমান উন্নত করা। ক্ষমতা সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি মাধ্যম; চূড়ান্ত উদ্দেশ্য নয়।
কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় যখন ক্ষমতা অর্জনই প্রধান বিবেচ্য হয়ে ওঠে, তখন নীতি ও আদর্শকে সুবিধামতো ব্যাখ্যা করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে ধর্মীয় স্লোগানও রাজনৈতিক কৌশলের অংশে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এখানেই সম্পাদকীয় প্রশ্ন—রাজনৈতিক দলগুলো কি নিজেদের ঘোষিত আদর্শের আলোকে ক্ষমতা অর্জন ও পরিচালনার চেষ্টা করছে, নাকি ক্ষমতার স্বার্থে আদর্শকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে?
এই প্রশ্নের উত্তর দলীয় পরিচয় দেখে নির্ধারণ করা যায় না। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী কিংবা অন্য যে দলই হোক, প্রত্যেকের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। প্রমাণ ছাড়া কোনো দলের উদ্দেশ্যকে অসৎ বলে ঘোষণা করা যেমন অনুচিত, তেমনি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখাও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির পরিপন্থী।
মুসলমানের আত্মসমালোচনা কি জরুরি নয়?
ধর্মীয় স্লোগান ও রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরেও মুসলমান সমাজের সামনে রয়েছে আত্মসমালোচনার প্রশ্ন। আমরা ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে কতটা সচেতন, আর ধর্মের নৈতিক শিক্ষা বাস্তব জীবনে কতটা অনুসরণ করি—তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পবিত্র কোরআনের সূরা আস-সাফের ২ ও ৩ নম্বর আয়াতে এমন কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে, যা নিজেরা করি না। এ শিক্ষা ব্যক্তি ও সমাজজীবনে কথার সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্যের গুরুত্ব তুলে ধরে।
একইভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিখ্যাত হাদিসে এসেছে, “নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।” —সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ১।
এই শিক্ষা আমাদের নিজেদের উদ্দেশ্য ও কাজ পর্যালোচনা করতে উদ্বুদ্ধ করে। তবে কারও একটি বক্তব্য বা রাজনৈতিক অবস্থান দেখে তার ঈমান কিংবা আকিদা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। বরং বক্তব্যের যথার্থতা, কাজের বাস্তবতা এবং ঘোষিত নীতির সঙ্গে আচরণের সামঞ্জস্য বিচার করাই যুক্তিসংগত পথ।
মুসলমানের পরিচয় শুধু ধর্মীয় স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। সত্যবাদিতা, ন্যায়বিচার, আমানতদারি, মানবিকতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থানও ইসলামী নৈতিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সম্প্রীতি চাই, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ নয়
“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”—বাক্যটির মূল্যায়ন করতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে, বক্তা এর মাধ্যমে কী বোঝাতে চাইছেন। যদি উদ্দেশ্য হয় সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, নাগরিক অধিকার ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা, তাহলে সেই উদ্দেশ্যকে ইতিবাচকভাবে দেখা যায়। কিন্তু যদি বাক্যটি ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাতন্ত্র্য অস্বীকার করতে কিংবা রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ধর্মীয় বিধানকে ইচ্ছামতো ব্যাখ্যা করতে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তার সমালোচনামূলক পর্যালোচনা জরুরি।
ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের বিশ্বাস বিসর্জন দেওয়ার প্রয়োজন নেই। একইভাবে নিজের বিশ্বাসে অবিচল থাকার অর্থও অন্যের অধিকার অস্বীকার করা নয়। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই একটি বহুধর্মীয় সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত ধর্মীয় বক্তব্যে দায়িত্বশীলতা বজায় রাখা, ধর্মকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার না করা এবং নিজেদের ঘোষিত মূল্যবোধের বাস্তব প্রতিফলন ঘটানো। ধর্মীয় নেতৃত্বেরও উচিত আবেগনির্ভর বিতর্কের পরিবর্তে প্রামাণ্য জ্ঞান, যুক্তি ও প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যার ভিত্তিতে মানুষকে সচেতন করা।
শেষ কথা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন প্রয়োজন কেবল স্লোগানের প্রতিযোগিতা নয়; প্রয়োজন নীতি, আদর্শ ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের সামঞ্জস্য। ধর্মের নামে রাজনীতি করা হলে সেই রাজনীতিতে নৈতিকতার প্রতিফলন থাকতে হবে। আর ধর্মীয় সম্প্রীতির কথা বলা হলে তা যেন সব নাগরিকের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকারের প্রতি বাস্তব শ্রদ্ধায় প্রকাশ পায়।
প্রশ্নটি তাই শুধু “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”—এই বাক্যের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে পারছি কি না; রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় নৈতিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারছি কি না; এবং কথার সঙ্গে কাজের মিল ঘটাতে পারছি কি না।
ক্ষমতা সাময়িক, কিন্তু নীতি ও বিবেকের প্রশ্ন স্থায়ী। ধর্ম মানুষের বিশ্বাস ও নৈতিকতার বিষয়—রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের ঢাল নয়।
এই উপলব্ধি ব্যক্তি, সমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হলেই ধর্মীয় সম্প্রীতি অর্থবহ হবে, আর রাজনীতি ফিরে পাবে তার প্রকৃত লক্ষ্য—জনগণের সেবা ও কল্যাণ।
প্রচ্ছদ নিয়ে আরও পড়ুন









দেশ-বিদেশের সর্বশেষ ও নির্ভুল খবর সবার আগে জানতে ভিজিট করুন নতুন দৃষ্টিতে।
সম্পাদক: মোঃ আহসান উল্লাহ | প্রকাশক: মোঃ আতাউর রহমান রুবেল |
৫৭৮, শিক্ষকপল্লী, গাইটাল, কিশোরগঞ্জ।
স্বত্ব © নতুন দৃষ্টি ২০২৫
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।