দেশ-বিদেশের সর্বশেষ ও নির্ভুল খবর সবার আগে জানতে ভিজিট করুন নতুন দৃষ্টিতে।
সম্পাদক: মোঃ আহসান উল্লাহ | প্রকাশক: মোঃ আতাউর রহমান রুবেল |
৫৭৮, শিক্ষকপল্লী, গাইটাল, কিশোরগঞ্জ।
স্বত্ব © নতুন দৃষ্টি ২০২৫
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।


কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণোৎসব ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। তিন দিনব্যাপী এ আয়োজনের দ্বিতীয় দিনে রোববার (১৮ অক্টোবর) লালন আখড়াবাড়িতে সমবেত হয়েছেন দেশ-বিদেশের হাজারো সাধু, বাউল, ভক্ত ও দর্শনার্থী। মরমি গানের সুর, সাধুসঙ্গ এবং লোকজ সংস্কৃতির নানা আয়োজনে প্রাণ ফিরে পেয়েছে আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণ।
আখড়াবাড়িতে আসা মানুষের পদচারণায় সকাল থেকেই মুখর ছিল পুরো এলাকা। কোথাও বাউলদের কণ্ঠে লালনগীতি, কোথাও সাধু-ভক্তদের ভাবসাধনা, আবার কোথাও দর্শনার্থীদের আনাগোনা। একতারা, দোতারা ও ঢোলের সুরে ছড়িয়ে পড়ছে লালন সাঁইয়ের মানবপ্রেম, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার বাণী।
সাধুসঙ্গ ও ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠান
স্মরণোৎসবের দ্বিতীয় দিনের সকালে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাল্যসেবা’। পরে দুপুরে বিশেষ খিলাফত গ্রহণের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় ‘পূর্ণসেবা’। লালন অনুসারীদের ঐতিহ্যবাহী এসব আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেন সাধু ও ভক্তরা। তাঁদের বিশ্বাস ও সাধনার ধারায় লালনের মানবধর্ম এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসার দর্শন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
লালনের গান ও দর্শন দীর্ঘদিন ধরে ধর্ম, বর্ণ ও জাতপাতের বিভেদ অতিক্রম করে মানুষের অন্তর্নিহিত পরিচয়কে সামনে নিয়ে এসেছে। স্মরণোৎসবেও সেই মানবিক দর্শনের চর্চা ও প্রচারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
আলোচনা সভায় গুরুত্ব পেল মানবধর্ম ও সম্প্রীতি
উৎসবের দ্বিতীয় দিনে আখড়াবাড়ির মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। এতে সভাপতিত্ব করেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি মো. তৌহিদ বিন-হাসান। প্রধান অতিথি ছিলেন খুলনা বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মো. আবদুল্লাহ হারুন। গেস্ট অব অনার হিসেবে বক্তব্য দেন বিশিষ্ট কবি, লেখক ও চিন্তক ফরহাদ মজহার।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. রেজাউল করিম, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম, ৪৭ বিজিবি কুষ্টিয়ার অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি (পিএসসি), কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা সোহরাব উদ্দিন এবং কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদ।
অনুষ্ঠানে মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন প্রাবন্ধিক অধ্যাপক ড. শেখ খালিদ হাসান। স্বাগত বক্তব্য দেন কুমারখালী উপজেলার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাভিদ সারওয়ার।
আলোচনায় বক্তারা লালনের মানবধর্ম, জাতপাতের ঊর্ধ্বে মানুষের আত্মিক পরিচয় এবং সমকালীন বিশ্বে তাঁর দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরেন। তাঁরা মানবিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশে লালনের গান ও দর্শনের গুরুত্বের ওপর আলোকপাত করেন।
রাতভর লালনগীতি, কালী নদীর তীরে লোকজ মেলা
আলোচনা সভা শেষে মূল মঞ্চে শুরু হয় লালনগীতি ও মরমি সংগীতানুষ্ঠান। লালন একাডেমি এবং দেশের বরেণ্য শিল্পীদের পরিবেশনায় রাতভর চলে সংগীতের আসর। এতে অংশ নেন টুনটুন বাউল, সুনীল কর্মকার, রওশন ফকির ও লতিফ শাহসহ বিশিষ্ট বাউলশিল্পীরা।
অন্যদিকে, আখড়াবাড়ির বাইরে কালী নদীর তীর ঘেঁষে বসেছে ঐতিহ্যবাহী লোকজ মেলা। মেলায় স্থান পেয়েছে গ্রামীণ তৈজসপত্র, একতারা ও ডুগডুগির মতো বাদ্যযন্ত্র, লালনবিষয়ক বই এবং বিভিন্ন ধরনের লোকশিল্পসামগ্রী। মেলাকে ঘিরেও দর্শনার্থীদের মধ্যে দেখা গেছে ব্যাপক উৎসাহ।
নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা
স্মরণোৎসব ও মেলাকে কেন্দ্র করে আখড়াবাড়ি এবং আশপাশের এলাকায় জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি এস আর বি-১২-এর বিশেষ কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে।
তিন দিনব্যাপী স্মরণোৎসব ও লোকজ মেলা সোমবার (১৯ অক্টোবর) শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। লালনের গান, সাধুসঙ্গ ও মানবতাবাদী দর্শনকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এ উৎসব আবারও তুলে ধরেছে বাংলার বাউল সংস্কৃতির ঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার।